ইউরোপের বাতিঘর

প্রথম আবদুর রহমান কর্তৃক স্থাপিত এবং পরবর্তী পর্যায়ে তার উত্তরাধিকারীদের দ্বারা সমৃদ্ধ কর্ডোভা ছিল তৎকালীন যুগের জগতমণি। ম্যুর সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র এই শহরের বৈভব ও গৌরব ছিল অতুলনীয়। শিক্ষা, সংস্কৃতি, আচার-ব্যবহার, রীতিনীতি, পোশাক-পরিচ্ছদ, স্থাপত্য, নিদর্শন, চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রভৃতি ক্ষেত্রে কর্ডোভার উৎকর্ষতা ইউরোপের সমাজ জীবনে এক শুভ অভ্যুদয় ঘটায়।

কর্ডোভার অবস্থানঃ কর্ডোভা স্পেনের অন্তর্গত এক নগরী। দৈর্ঘ্যে ২৪ মাইল ও প্রস্থে ৬ মাইল এবং পরিধিতে ১৪ মাইল সৌন্দর্য্যমণ্ডিত কর্ডোভা নগরী ছিল খুবই সুরক্ষিত।

কর্ডোভাতে মুসলমানদের আগমনঃ দামেস্কের উমাইয়া খলিফা আল-ওয়ালিদের অনুমতিক্রমে সেনাপতি তারিক-বিল-জিয়াদ ৭১১ সালে আফ্রিকা থেকে ১৭ মাইল দূরে জিব্রাল্টার প্রণালীর উত্তর পাড়ে স্পেনে অভিযান পরিচালনা করেন। রাজা রডরিক লক্ষাধিক সৈন্য নিয়েও মুসলিম বাহিনীর নিকট পরাজিত হয়। অতঃপর একে একে সমস্ত স্পেন মুসলিম অধিকারে আসে। কর্ডোভা মুসলিম স্পেনের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়।

ইউরোপের বাতিঘর নামকরণের কারণঃ সমসাময়িককালে কর্ডোভা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও স্থাপত্য শিল্পে সর্বাপেক্ষা অগ্রসরমান নগরী ছিল।

স্থাপত্য শিল্পঃ আবদুর রহমান আদ-দাখিল ৮০,০০০ দিনার ব্যয়ে এক জামে মসজিদ নির্মাণ করেন। এই জামে মসজিদ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য স্থাপত্য কীর্তির মধ্যে এক উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। কর্ডোভার স্থাপত্য ইতিহাসে আজ জাহরা প্রাসাদ অনন্য সৌন্দর্যে সুষমামণ্ডিত। কর্ডোভার ৫ মাইল উত্তর Hill of Bride এর পাদদেশে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ক্রোড়ে এই সুরম্য প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়।

শিক্ষা ব্যবস্থাঃ কর্ডোভার শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত ছিল বিধায় ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা হতে বিদ্যার্থীগণ কর্ডোভাতে ছুটে যেত। অসংখ্য কবি, ভাষাবিদ, সাহিত্যিক, বৈয়াকরণ, শাস্ত্রবিদ, চিকিৎসক, ঐতিহাসিক, দার্শনিক, জ্যোতির্বিদ কর্ডোভার জ্ঞান ভাণ্ডারের সাথে জড়িত ছিলেন। কর্ডোভাতে ২০,০০০ বইয়ের দোকান ছিল।

চিকিৎসা কেন্দ্রঃ কর্ডোভার চিকিৎসা ব্যবস্থা খুবই উন্নত ছিল। কর্ডোভাতে ৫০ টি হাসপাতাল ছিল।

প্রাসাদ-বিপণিঃ দুই লক্ষাধিক অট্টালিকা, ষাট হাজার প্রাসাদ এবং চুরাশি হাজার বিপণি কর্ডোভাকে তিলোত্তমা নগরীতে পরিণত করেছিল।

শিল্পঃ বস্ত্রশিল্প, চর্মশিল্প, লৌহ এবং অলঙ্কার তৈরির শিল্পে কর্ডোভা সমৃদ্ধ ছিল। উন্নতমানের মিহি সুতিবস্ত্র, রেশম সিল্ক ও লিনেন বয়নে কর্ডোভার বয়ন শিল্পীরা খুবই দক্ষ ছিলেন।

অজু-গোসলের ব্যবস্থাঃ মধ্যযুগীয় ইউরোপে স্নানকে যেখানে কুসংস্কার বলে মনে করা হতো তখন কেবল কর্ডোভায় ৯০০ স্নানাগার ছিল।

গ্রন্থাগারঃ কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ব্যতীত কর্ডোভাতে আরো ৭০ টি গ্রন্থাগার ছিল। গ্রন্থাগারগুলোতে ৪,০০,০০০ পাণ্ডুলিপি রক্ষিত ছিল। ক্রমিক সংখ্যা নিরূপনের জন্য ৪৪ খানা বালাম বই ছিল।

উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থাঃ কর্ডোভার সড়কগুলো ছিল পাকা গাঁথুনিতে মসৃণ ও মজবুত। রাস্তায় বাতির ব্যবস্থা ছিল। ড্রেপার বলেন, “সূর্যাস্তের পর একজন লোক রাস্তার বাতির সাহায্যে সরল রেখাক্রমে দশ মাইল পথ পদব্রজে যেতে পারত। সাত’শ বছর পরেও লন্ডনে কোন সরকারি বাতি ছিল না।”

তমসাচ্ছন্ন ইউরোপে স্পেনের কর্ডোভাতেই জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-দীক্ষা, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির আলোকবর্তিকা সর্বপ্রথম প্রজ্বলিত হয়। কর্ডোভা যখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত তখন অনাচার, ব্যভিচার, অসভ্যতা ও নিম্নমানের জীবন ব্যবস্থায় ইউরোপীয়রা কালাতিপাত করত। মধ্যযুগে কর্ডোভা ছিল পৃথিবীব্যাপী সংস্কৃতি ও সভ্যতার মশালধারী। মধ্যযুগে তমসাচ্ছন্ন ইউরোপ কর্ডোভা যে আলোকবর্তিকা প্রজ্বলন করেছিল সেই কারণে তাকে ইউরোপের বাতিঘর বলা হয়।

ওয়াজিরাত কি?

মুসলিম প্রশাসনের ইতিহাসে “ওয়াজিরাত” একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান রূপে কাজ করেছে। আব্বাসীয় খলিফাগণ সর্বপ্রথম এ পদটির প্রবর্তন করেন। অসাধারণ প্রতিভা সম্পন্ন আরো পড়ুন

বাগদাদ নগরী

আব্বাসীয় খিলাফতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা আব্বাস আস-সাফফা আব্বাসীয় শাসন সুদৃঢ় ভিত্তির উপর পরিচালিত করার জন্য আবহাওয়া অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক বিবেচনা আরো পড়ুন

কুসায়ের আমরা

৭১১-৭১৫ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া খলিফা আল ওয়ালিদ এর রাজত্বকালে জর্দানের রাজধানী আম্মানের প্রায় পঞ্চাশ মাইল পূর্বে ওয়াদি বাতুম নামক স্থানে কুসায়ের আরো পড়ুন

মসজিদের অলঙ্করণ

মুসলিম স্থাপত্যের ইতিহাসে মসজিদের অলঙ্করন রীতি বহু পূর্ব থেকেই প্রচলিত। মসজিদের সৗন্দর্য্য বর্ধনের জন্য বিভিন্ন যুগে নির্মিত মসজিদে বিভিন্ন অলঙ্করন আরো পড়ুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।