ওয়াজিরাত কি?

ওয়াজিরাত

মুসলিম প্রশাসনের ইতিহাসে “ওয়াজিরাত” একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান রূপে কাজ করেছে। আব্বাসীয় খলিফাগণ সর্বপ্রথম এ পদটির প্রবর্তন করেন। অসাধারণ প্রতিভা সম্পন্ন ব্যক্তিরাই এ পদের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হতেন। আব্বাসীয় প্রশাসন ব্যবস্থায় খলিফার পরই ছিল উজিরের স্থান।

ওয়াজির শব্দের উৎপত্তিঃ মুসলিম চিন্তাবিদগণের সবাই একমত পোষণ করেন যে, ‘ওয়াজির’ শব্দটির উৎপত্তি মূলত আরবি শব্দ হতে। আল মাওয়াদীর মতে, “ওয়াজির” শব্দটি মূল আরবি তিনটি শব্দ থেকে উৎপত্তি হতে পারে।

১. ইহা মূল আরবি ভিঝর (বোঝা) হতে আসতে পারে। কেননা ওয়াজির রাষ্ট্রের নানারূপ বোঝা বা দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

২. ইহা আজর (মেরুদণ্ড) হতেও উৎপত্তি হতে পারে; যেহেতু শাসকবর্গ ওয়াজিবের মাধ্যমে নিজেদের শাসন ব্যবস্থাকে মজবুত করে থাকেন।

৩. ইহা মূল ওয়াজির (আশ্রয়) শব্দ হতে উৎপত্তি হতে পারে। এ ছাড়া বিখ্যাত কতকগুলো আরবি কবিদের রচনায়ও ওয়াজির শব্দটি দেখতে পাওয়া যায়।

ওয়াজিরের যোগ্যতাঃ মুসলিম রাজনৈতিক চিন্তাবিদগণের মতে, উজিরকে পলো, দাবাখেলা ও সঙ্গীতে পারদর্শিতা হতে আরম্ভ করে অঙ্কন শাস্ত্র, জ্যোতিবিদ্যা, চিকিৎসা শাস্ত্র, কাব্য, ব্যাকরণ, ইতিহাস, কবিতা-আবৃতি, গল্পবলা প্রভৃতি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অভিজ্ঞ হতে হতো। রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা পরিচালনায় পারদর্শী ও যথাসম্ভব ন্যায়নিষ্ঠ, সৎ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাই উজির নিযুক্ত হতেন।

ওয়াজিরের শ্রেণি বিভাগঃ ক্ষমতা ও কার্যাবলীর দিক দিয়ে বিচার করে আল মাওয়াদি উজির দিগকে দু’ভাগে ভাগ করেন। যেমন-

১. অসীম ক্ষমতা সম্পন্ন উজির ২. সীমিত ক্ষমতা সম্পন্ন উজির।

১. অসীম ক্ষমতা সম্পন্ন উজিরঃ অসীম ক্ষমতা সম্পন্ন উজির প্রাদেশিক গভর্ণর, বিচারক ও কেন্দ্রীয় সরকারের পদস্থ কর্মচারীদের নিয়োগ ও বরখাস্ত করতে পারতেন। খলিফার মত তিনি সর্বোচ্চ বিচার পতির দায়িত্ব পালন এবং কখনো মাযালিম কোর্টে সভাপতিত্ব করতেন। রাজস্ব আদায় এবং রাষ্ট্রীয় আয়-ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ছিল উজিরের বিশেষ দায়িত্ব।

২. সীমিত ক্ষমতা সম্পন্ন উজিরঃ খলিফার আদেশ নিষেধ কার্য্যকর করাই ছিল সীমিত ক্ষমতা সম্পন্ন উজিরের প্রধান কর্তব্য। প্রশাসনিক ব্যাপারে তিনি কোন প্রকার নিজস্ব সিদ্ধান্ত কার্য্যকর করতে পারতেন না। আল মাওয়াদির মতে, “এ ধরনের উজির ছিলেন একদিকে খলিফা এবং অন্য দিকে প্রাদেশিক গভর্ণর ও জনগণের মধ্যে যোগসূত্র স্বরূপ।”

উজিরের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাঃ বিশেষ তিন বিষয়ে উজিরের ক্ষমতা ছিল সীমিত। যেমন-

১. উজির তার উত্তরাধিকারী অথবা প্রতিনিধি নিয়োগ করতে পারতেন।

২. খলিফা উজির কর্তৃক নিয়োগ বাতিল করতে পারতেন, কিন্তু ওয়াজির খলিফা কর্তৃক নিয়োগকৃত কাউকে বরখাস্ত করতে পারতেন না।

৩. রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ব্যাপারে উজিরের গৃহীত যে কোন পদক্ষেপ খলিফাকে অবহিত করতে হতো।

উজিরের বেতনঃ উজিরের ব্যাপক দায়িত্বের বিবেচনায় তাকে রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের মধ্যে সর্বোচ্চ বেতন দেওয়া হতো। দশম শতাব্দীতে উজিরকে মাসে ৫০০০ দিনার এবং পরবর্তীকালে মাসে ৭০০০ দিনার বেতন দেওয়া হতো। বেতন ব্যতীত উজির বিশাল জায়গিরও ভোগ করতেন। এছাড়া তারা নানা উপঢৌকনও গ্রহণ করতেন।

উজিরের পোশাক-পরিচ্ছদঃ আব্বাসীয় যুগের অন্যান্য সরকারি কর্মচারীদের মত উজিরও কালো সরকারি পোশাক পরিধান করতেন। উজিরের পোশাকের মধ্যে ছিল ঢিলা আবরণী জামা, কোর্ট, শার্ট ও জুতা।

উজিরের প্রভাব ও প্রতিপত্তি আব্বাসীয় আমলে অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের উন্নতি সাধনে সহায়ক ভূমিকা পালন করলেও তাদের ক্রমবর্ধমান লোভ, অর্থমোহ, স্বেচ্ছাচারিতা, প্রসাদ ষড়যন্ত্র এক সময় আব্বাসীয় খিলাফতের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।