কাবাঘর

মাটির নির্মিত গৃহ ব্যতীত প্রাক ইসলামি আরবে ‘বায়তুল্লাহ’ (আল্লাহর ঘর) বা কাবা শরিফ একমাত্র উল্লেখ করার মতো স্থাপত্যিক নিদর্শন। ঐতিহাসিকগণ মনে করেন, কাবাগৃহ ছিল মুসলিম স্থাপত্যের প্রথম নিদর্শন।

কাবাগৃহের নামকরণঃ কাবা শব্দটি ‘কাব’ মূল শব্দ হতে নির্গত হয়েছে। এর অর্থ উচু কিংবা মর্যাদা সম্পন্ন বস্তু। সাধারণত মাটির স্তর থেকে কাবার ভিত্তি প্রস্তুর উঁচুতে সংস্থাপন করা হয় বলে একে কাবা বলা হয়ে থাকে। উপরন্তু মক্কায় হারেম শরিফ সবচেয়ে পবিত্র ঘর এবং মর্যাদার অধিকারী বলে একে কাবা নামে অভিহিত করা যায়।

নির্মাণের উদ্দেশ্যঃ পবিত্র কোরআন মজিদের সুরা ইমরানের ৯৬ নং আয়াতের উদ্ধৃতি অনুসারে জানা যায় যে, ‘মানব কুলের হেদায়েতের দিগদর্শন হিসেবে মক্কায় সর্বপ্রথম এই ঘরটির ভিত্তি প্রস্তুর স্থাপিত হয়। আল ইয়াকুবীর তথ্য থেকে জানা যায়, হযরত আদম (আঃ)-এর জন্মের দুই হাজার বছর পূর্বে ফেরেশতাগণ আল্লাহ পাকের উপাসনা করার উদ্দেশ্যে এ ঘর নির্মাণ করেন।

নির্মাণ উপকরণঃ কাবা শরিফ প্রস্তর নির্মিত ছিল। হযরত আদম (আঃ) আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক পাঁচটি পর্বতের পাথর দিয়ে কাবাগৃহের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন। ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হয় হেরা পর্বতের পাথর দিয়ে। এরপর এর উপরিভাগের অবশিষ্ট অংশ নির্মাণে তুরেসিনা, তুরে যাইতুন, তুবে লাবনান ও জুদী পাহাড়ের পাথর ব্যবহৃত হয়।

গঠন প্রণালিঃ কাবাগৃহ প্রস্তর নির্মিত হলেও প্রথম অবস্থায় এর কোন ছাদ নির্মিত হয়নি। এ ইমারতের উত্তর-পূর্ব দিকের পরিমিতি ছিল ৩২ হাত, উত্তর-পশ্চিমে ২২ হাত, দক্ষিণ-পশ্চিমে ৩০ হাত এবং দক্ষিণ-পূর্ব ২০ হাত। দেয়ালের উচ্চতা ছিল ৯ হাত। যমযম কূপ এর অভ্যন্তরে ছিল।

কাবাগৃহের পুননির্মাণঃ কাবা শরিফের নির্মাণ ও পুনঃনির্মাণ দশবার সংঘটিত হয়। ৬০৮ খ্রিস্টাব্দে কাবাগৃহের পুনঃনির্মাণের সময় এর ভিত্তিমূলে প্রথম কোর্স বা স্তর পাথর দ্বারা সংস্থাপন করা হয়। এর উপর দ্বিতীয় স্তরে কাঠ স্থাপন করা হয়। প্রাচীরের শীর্ষ পযর্ন্ত মোট ৩১ টি স্তর ছিল। এর ১৬টি পাথরের স্তর ও ১৫টি কাঠের স্তর ছিল। ছাদ নির্মাণে কাঠের ব্যবহার করা হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। মহানবীর নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বে এর পুনঃনির্মাণ হয়। মহানবী কাবাগৃহে হযরে আসওয়াদ পাথর স্থাপন করেন।

বহিঃপ্রভাবঃ কাবা ঘর নির্মাণে বহিঃপ্রভাব লক্ষ্য করা যায়। প্রাক ইসলামি আরবের বিখ্যাত ঐতিহাসিক আযরাকীর দেয়া তথ্যানুসারে আবিসিনীয় খ্রিষ্টান কারিগর বাকুমকে কাবাগৃহের পুনঃনির্মাণের কাজে লাগানো হয়। তিনি কাঠমিস্ত্রি ও রাজমিস্ত্রি ছিলেন। বাকুম কাবাগৃহের পুনঃনির্মাণে আবিসিনীয় পদ্ধতিতে পর্যায়ক্রমে একস্তর পাথর ও একস্তর কাঠের সাহায্যে নির্মাণ করেন। অতএব বলা যায় কাবাগৃহের এ বিশেষ নির্মাণ কৌশলের উৎস ছিল আবিসিনীয় স্থাপত্যের নিদর্শন।

কাবাগৃহ প্রস্তর নির্মিত হলেও প্রথম অবস্থায় কোন ছাদ নির্মিত হয়নি। একারণে ইহা ঠিক স্থাপত্য ইমারতের আওতায় পড়ে না। তথাপি ইসলাম পূর্ব আরবে তেমন কোন স্থাপত্য নিদর্শন না থাকায় কাবাগৃহকে প্রাক ইসলামি স্থাপত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।