কুফা মসজিদ

কুফা মসজিদ মুসলিম স্থাপত্যের ইতিহাসে এক অনবদ্য আসনের অধিকারী। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রাঃ)-এর গৌরবময় শাসনকালে পারস্য বিজয়ী বীর সেনানী সাদ-বিন-আবি ওয়াক্কাসের প্রচেষ্টায় কুফা নগরীর গোড়াপত্তন হয়। ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে সাদ এখানে একটি জামে মসজিদের গোড়াপত্তন করেন। এ মসজিদটিই ঐতিহাসিক কুফা মসজিদ নামে খ্যাত।

স্থান নির্বাচনঃ কুফা মসজিদের সীমানা নির্ধারিত হয়েছিল এক অদ্ভুত পন্থায়। হযরত সাদ (রাঃ) তার একজন বিশ্বস্ত তীরন্দাজকে এক উচু স্থান থেকে দাঁড়িয়ে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমে তীর নিক্ষেপের নির্দেশ দেন। এভাবে তীর নিক্ষেপের দ্বারা চতুর্দিকে দুরত্বের পরিমাপ নিয়ে কুফা মসজিদের সীমানা নির্ধারণ করা হয়।

মসজিদের বর্ণনাঃ কুফা জামে মসজিদটি ছিল বর্গাকৃতি এবং এক এক দিকের দৈঘ্য ছিল ২০০ বর্গ হাত। প্রথম অবস্থায় প্রাচীন নির্মাণ না করে এ মসজিদের চতুর্দিকে পরিখা নির্মাণ করে এর পবিত্রতা রক্ষা করা হয়। মসজিদ সংলগ্ন কিবলার দিকে একটি শাসনকর্তার ভবন নির্মিত হয় এবং একটি সাধারণ কোষাগারও স্থাপন করা হয়।

স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্যঃ কুফা জামে মসজিদের একমাত্র স্থাপত্যিক উপকরণ ছিল ২০০ হাত লম্বা ছাদবিশিষ্ট নামাজ ঘর যা ‘জুল্লাহ নামে পরিচিত। জুল্লাহর নির্মাণ কৌশল ছিল অত্যন্ত আকষর্ণীয়। খেজুর গাছের কাণ্ডের স্থলে সাদা পাথরের তৈরি স্তম্ভ দ্বারা জুল্লাহ নির্মিত হয়। জুল্লাহয় কতটি মার্বেল স্তম্ভের সারি ছিল তা বলা যায় না। তবে মনে হয়, পাঁচটি সারিতে জুল্লাহ বিভক্ত ছিল। মদিনা মসজিদের অনুকরণে কুফা মসজিদের ছাদ নির্মাণ করা হয়। এ মসজিদের ছাদ নির্মাণে শুষ্ক ঘাস ও নল খাগড়া ব্যবহৃত হয়েছিল। কুফা মসজিদের আঙ্গিনা একদিকে ছিল। পরবর্তীকালে মসজিদের তিনদিকে চালাযুক্ত বারান্দা নির্মাণ করা হয়। কিবলা ছিল দক্ষিণ দিকে। কিবলা নির্দেশ করার মতো মিহরাব ছিল না। সাদ নির্মিত কুফা মসজিদে মিহরাব, মিম্বার ও মিনার ছিল না। এ মসজিদের স্তম্ভগুলো ছিল ৫২ (ফুট) উচ্চতাবিশিষ্ট।

সংস্কার ও সম্প্রসারণঃ মুয়াবিয়ার শাসনামলে ৬৭০ খ্রিষ্টাব্দে গভর্নর জিয়াদ ইবনে আবির্হি কুফা মসজিদের সংস্কার ও সম্প্রসারণ করেন। আহওয়াজ পর্বত হতে আনীত প্রস্তর খণ্ড দ্বারা মসজিদের স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছিল। মসজিদের ছাদকে এ সময় ৩০ হাত উচুতে স্থাপন করা হয়েছিল। এ মসজিদের উত্তরদিকে ৪টি এবং পূর্ব ও পশ্চিম দিকে ৩টি করে ৬টি প্রবেশ পথ ছিল। স্পেনীয় পরিব্রাজক ইবনে যুবায়ের ১১৮৪ খ্রিষ্টাব্দে এই মসজিদটি পরিদর্শন করে মন্তব্য করেন যে, মসজিদটি আয়তনে সুবৃহৎ।

গুরুত্বঃ কুফা মসজিদটি পরিধি ও স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যে অতুলনীয় ছিল। পরবর্তী ২০০ বছর যাবৎ এ মসজিদকে মডেল ধরে ইসলামি বিশ্বে অসংখ্য মসজিদ নির্মিত হয়। এ মসজিদের ব্যতিক্রমধর্মী বিষয়াদি যেমন প্রাচীরের পরিবর্তে পরিখা দিয়ে বেষ্টন, উঁচু ছাদ, তিনদিকে ঘেরা চালনযুক্ত বারান্দা, বর্গাকৃতি ইত্যাদি পরবর্তীকালে মসজিদ নির্মাণে অনুকরণীয় হয়।

মুসলিম স্থাপত্য শিল্পের ইতিহাসে কুফা মসজিদের অবদান অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। এ মসজিদ নির্মাণে স্থাপত্যিক রীতি-কৌশল, সৃজনশীলতা ও কারুশিল্পের দক্ষতা প্রকাশ পায়। ঐতিহাসিক ক্রেসওয়েল যথার্থই মন্তব্য করেছেন, “কুফায় নির্মিত মসজিদটি স্থাপত্য শিল্পের ইতিহাসে প্রশংসা অর্জনকারী মসজিদ।”

ওয়াজিরাত কি?

মুসলিম প্রশাসনের ইতিহাসে “ওয়াজিরাত” একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান রূপে কাজ করেছে। আব্বাসীয় খলিফাগণ সর্বপ্রথম এ পদটির প্রবর্তন করেন। অসাধারণ প্রতিভা সম্পন্ন আরো পড়ুন

ইউরোপের বাতিঘর

প্রথম আবদুর রহমান কর্তৃক স্থাপিত এবং পরবর্তী পর্যায়ে তার উত্তরাধিকারীদের দ্বারা সমৃদ্ধ কর্ডোভা ছিল তৎকালীন যুগের জগতমণি। ম্যুর সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র আরো পড়ুন

বাগদাদ নগরী

আব্বাসীয় খিলাফতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা আব্বাস আস-সাফফা আব্বাসীয় শাসন সুদৃঢ় ভিত্তির উপর পরিচালিত করার জন্য আবহাওয়া অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক বিবেচনা আরো পড়ুন

কুসায়ের আমরা

৭১১-৭১৫ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া খলিফা আল ওয়ালিদ এর রাজত্বকালে জর্দানের রাজধানী আম্মানের প্রায় পঞ্চাশ মাইল পূর্বে ওয়াদি বাতুম নামক স্থানে কুসায়ের আরো পড়ুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।