ক্রুসেড বলতে কি বুঝ?

ক্রুসেড বলতে কি বুঝ

জেরুজালেম ছিল যিশুখ্রিস্টের জন্মভূমি এবং মুসা (আঃ) দাউদ (আঃ) ও মুহম্মদ(সাঃ)-এর বহু স্মৃতিবিজড়িত অতি পবিত্র স্থান। এজন্য ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমান এই তিন ধর্মাবলম্বীর কাছে জেরুজালেম ছিল সমান পবিত্র স্থান। কিন্তু জেরুজালেমে মুসলমানদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে খ্রিস্টানরা অস্বস্তিবোধ করে। এছাড়া ১০০৯ সালে মিশরের ফাতেমীয় খলিফাদের শাসনকালে জেরুজালেমের কয়েকটি গির্জা বিনষ্ট হয় এবং পরবর্তীকালে সেলজুক তুর্কিগণ খ্রিস্টান তীর্থযাত্রীদের প্রতি কঠোরতা ও অসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করলে পোপ দ্বিতীয় আরবান ১০৯৫ সালে ফ্রান্সের ক্লারমেন্টে এক সম্মেলন আহবান করে ইউরোপীয় রাজন্যবর্গ এবং খ্রিস্টান সমাজকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে নির্দেশ প্রদান করেন। পোপ ধর্মযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের এই আহবানের ফলে ১০৯৫ সালে ১৫০,০০০ ফ্রাঙ্ক, নর্মান ও খ্রিস্টান সৈন্য কনস্ট্যন্টিনোপলে সমবেত হয়। ইতিহাসে এই ধর্মযুদ্ধ ক্রুসেড নামে পরিচিত।

ক্রুসেডের সংজ্ঞাঃ ক্রুসেড বলতে বুঝায় ধর্মযুদ্ধ। মুসলমানদের কাছ হতে যিশুখ্রিস্টের পবিত্র জন্মভূমি জেরুজালেম উদ্ধার করার জন্য ইউরোপের খ্রিস্টান জগৎ মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রায় তিনশত বছর ধরে [১০৯৫-১২৯৫] খ্রিঃ] যে যুদ্ধ পরিচালিত করে ইতিহাসে তা ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ নামে পরিচিত। খ্রিস্টানরা ধর্মের নামে এই যুদ্ধ করে বলে একে ধর্মযুদ্ধও বলা হয়। মূলত খ্রিস্টান যোদ্ধাগণ তাদের বুকের উপর লাল রং-এর ক্রুশ চিহ্ন ধারণ করত বলে এই যুদ্ধের নামকরণ করা হয় ক্রুসেড। আসলে এই যুদ্ধ ছিল আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশের মুসলমানদের সাথে ইউরোপীয় খ্রিস্টানদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঘৃণা, বিদ্বেষ ও আত্মকলহের বহিঃপ্রকাশ। ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সফল বীরযোদ্ধা ছিলেন মিশরে আইয়ুবী বংশের প্রতিষ্ঠাতা সালাউদ্দীন আইয়ুবী। তিনি হিত্তিনের যুদ্ধে ক্রুসেডারদের পরাজিত করে পবিত্র জেরুজালেম নগরী দখল করেন। ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ড, ফ্রান্সের রাজা ফিলিপ এবং জার্মানীর ফ্রেডারিক বার্বারোসার নেতৃত্বে ক্রুসেডারগণ জেরুজালেম উদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালায় কিন্তু তাদের সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। অবশেষে ১১৯২ সালে গাজী সালাউদ্দীন আইয়ুবীর সাথে ক্রুসেডারগণ সন্ধি করতে বাধ্য হয়। ক্রুসেডে অসাধারণ বীরত্ব ও মহত্ত্ব প্রদর্শন করে সালাহউদ্দীন মুসলমানদের চরম পরাজয়ের হাত থেকে রক্ষা করেন।

ক্রুসেড ছিল ইউরোপের খ্রিস্টান জগতের মুসলমানদের প্রতি দীর্ঘদিনের হিংসা, বিদ্বেষ ও ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। এতে বহু সভ্যতা ও জনপদ ধ্বংস হয়ে যায়। এমনকি বহু জীবনের বিনিময়েও এর চূড়ান্ত মীমাংসা হয়নি। তবে এর ফলে শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সংযোগ ঘটে। যার মাধ্যমে ইউরোপে রেনেসাঁর উদ্ভব ঘটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।