গ্রানাডার নাসিরীয় বংশ

স্পেনে মুসলিম রাজত্বের শেষ অধ্যায়ে গ্রানাডার উত্থান-পতন উল্লেখযোগ্য ঘটনা। সুদীর্ঘ আড়াই শত বছরেরও (১২৩২-১৪৯২) অধিককাল এ বংশ গ্রানাডার বিপুল বৈভব ও বিস্তর শানশওকতের সাথে তাদের আধিপত্য কায়েম রাখেন। এসময় তারা তমসাচ্ছন্ন ইউরোপ ভূ-খণ্ডে জ্ঞানের বিদ্যুৎ প্রবাহ সৃষ্টি করেন। ১৪৯২ সালে এ বংশের পতনের সাথে স্পেনে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে।

নসর বংশ প্রতিষ্ঠাঃ বনু নসরের মতে, তাদের আদি পুরুষ হলেন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর সমসাময়িক মদিনার খাজরাজ দলপতি সাদ বিন উবাদা। উমাইয়াদের স্পেন বিজয়ের সময় বনু নসরের পিতৃপুরুষগণ সেনাপতি মুসার সৈন্যদলে ছিলেন এবং পরবর্তীতে সেনাবাহিনীতে বিশেষ সম্মানের পদ দখল করে স্পেনে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। ১২৩২ সালে মুয়াহহিদ বংশের (১১৪৬-১২৬৯) দুর্বলতার সুযোগে খ্রিস্টানগণ ক্রমে ক্রমে তাদের অধিকৃত অঞ্চল ও দুর্গগুলো হস্তগত করতে থাকে। মুরসিয়াতে বনু হুদ ও ভ্যালেনসিয়াতে বনু মারাদানিস সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে আত্মকলহে নিমগ্ন হয়। এমতাবস্থায় পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে কর্দোবার আরজোনা দুর্গের অধিপতি মুহাম্মদ বিন ইউসুফ বিন আহাম্মদ বিন নসর আরজোনাতে নিজেকে স্বাধীন সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন। জায়েন, বায়রজা প্রভৃতি অঞ্চলের জনগণ তাকে বিপুলভাবে সমর্থন জ্ঞাপন করেন। ক্যাস্টহিলের রাজা এবং ফার্ডিন্যান্ডের সাথে তিনি মৈত্রীচুক্তি স্থাপন করে তাদের সাহায্যে ১২৩৭ সালে গ্রানাডা দখল করেন। গ্রানাডা অধিকারের পর তিনি এখানে রাজধানী স্থাপন করেন।

গ্রানাডার নসর বংশের পতনঃ গৃহযুদ্ধ ও অন্তর্বিপ্লবের ফলে পঞ্চদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে গ্রানাডার নসর বংশ অতিদ্রুত ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়। এসময় আরাকানের রাজা ফার্ডিন্যান্ড ও ক্যাস্টাইলের রাজি ইসাবেলা ১৪৬৯ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গ্রানাডা থেকে মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করার দৃঢ় শপথ গ্রহণ করেন। এসময় গ্রানাডার সুলতান ছিলেন আবুল হাসান।

১৪৮২ সালে ফার্ডিন্যান্ড ও ইসাবেলা গ্রানাডার প্রবেশদ্বার আল হামারা দুর্গ অধিকার করেন। রাজপরিবারের অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে আবুল হাসান দু’বার আল হামারা দুর্গ অধিকারের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এসময় আবুল হাসানের পুত্র বোয়ালবিদ পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে ১৪৮২ সালে আল হামারা পুনরুদ্ধার করেন এবং কাযর্ত গ্রানাডার সিংহাসন দখল করে পিতাকে মালাগায় আশ্রয় নিতে বাধ্য করেন। তখন মালাগার শাসনকর্তা ছিলেন আবুল হাসানের ভ্রাতা আজ জাগাল। ১৪৮৩ সালে বোয়ালবিদ খ্রিস্টান শহর লুসানা আক্রমণ করে পরাজিত ও বন্দী হন। বোয়ালবিদ বন্দী হলে আবুল হাসান পুনরায় গ্রানাডার সিংহাসনে বসেন তবে তিনি তার ভ্রাতা জাগালের পক্ষে সিংহাসন ত্যাগ করেন। ইসাবেলা ও ফার্ডিন্যান্ড বন্দী বোয়ালবিদকে গ্রানাডা ধ্বংসের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। একদল সৈন্য দিয়ে তারা বোয়ালবিদকে পিতৃব্য আজ জাগালের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। ফলে ১৪৮৭ সালে আজ জাগাল আত্মসমর্পণ করে মরক্কো চলে যান। ১৪৮৭ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেই বোয়ালবিদ খ্রিস্টানদের প্রকৃত প্রতারণায় সম্মুখীন হন। ফার্ডিন্যান্ড ১৪৯০ সালে বোয়ালবিদকে গ্রানাডা সমর্পণ করতে আদেশ দেন। কিন্তু বোয়ালবিদ এতে অস্বীকৃতি জানালে খ্রিস্টান সৈন্যরা ৪০,০০০ পদাতিক ও ১০,০০০ অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে গ্রানাডা আক্রমণ করেন। মুসলমানগণ বিখ্যাত সেনাপতি মুসা বিন আবুল গাজানের নেতৃত্বে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করলেও ফার্ডিন্যান্ড নগরের মধ্যে সকল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে মুসলমানদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেন। ১৪৯২ সালের ২ জানুয়ারি স্পেনে মুসলিম শাসনের শেষ চিহ্ন গ্রানাডার পতন ঘটে।

সেনাপতি মুসা বিন নুসায়েরের শৌর্যে ৭১২ সালে স্পেনে যে মুসলিম শাসনের সূত্রপাত হয় ১৪৯২ সালে ঐ একই নামে মুসার জীবনাবসানে সেই শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে। ১৫৩৮ সালে আলপুক্সরাসে নির্বাসিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।