ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ কাকে বলে?

পলাশির যুদ্ধের পর হতে আঠারো শতকের শেষ অবধি বাংলার রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার সুযোগে আধ্যাত্মিক সাধনায় নিয়োজিত বাংলার ফকির-সন্ন্যাসী তথা নিরীহ সাধক সম্প্রদায় শাহ মজনুর নেতৃত্বে তাদের পার্থিব আকাঙ্ক্ষা মেটানোর অভিপ্রায়ে বাংলায় নিজেদের প্রাধান্য বিস্তারের জন্য ইংরেজদের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন শুরু করে তা বাংলার ইতিহাসে ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলন নামে অভিহিত।

ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলনঃ পলাশি যুদ্ধের পর রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার সুযোগে ফকির ও সন্ন্যাসীরা বিদ্রোহী হয়ে উঠে। প্রথমত তারা লুটতরাজ ও দস্যুবৃত্তি করে শক্তিশালী হয়ে উঠে। অতঃপর ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হয়। চাকরিহারা অনেক সৈনিক ও দুর্দশাগ্রস্ত বহু কৃষক তাদের সাথে যোগ দেয়। তারা শাহ মজনুর নেতৃত্বে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ওয়ারেন হেস্টিংসের রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, ১৭৬৩ সালে ফকিররা বরিশালে ইংরেজ কুঠি আক্রমণ ও দখল করে। এরপর রাজশাহী ও উত্তর বাংলায় তাদের আধিপত্য সুদৃঢ় করে। ১৯৬৭ ও ১৯৬৯ সালে ফকির ও সন্ন্যাসীদের সাথে কোম্পানির সংঘর্ষ হয় এবং এই সংঘর্ষে ইংরেজ সেনাধ্যক্ষ মার্টল ও লেফটেন্যান্ট কিথসহ অনেক সৈন্য নিহত হয়। এই সাফল্যের পর শাহ মজনুর নেতৃত্বে ফকিররা প্রতিবছর রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, পাবনা, ময়মনসিংহ, ঢাকা প্রভৃতি অঞ্চলে লুটতরাজ করে সরকারি ধনাগার লুণ্ঠন করে। অতঃপর তারা সামরিক দিক দিয়েও অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠার প্রয়াস নিলে ইংরেজ সরকারও তাদের প্রতিরোধ করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে। ১৭৮৭ সালে শাহ মজনুর মৃত্যুর পর সুযোগ্য নেতৃত্বের অভাবে এবং ইংরেজ নিপীড়নের ফলে ফকির-সন্ন্যাসীদের শক্তি খর্ব হয়। ফলে তারা পালিয়ে বিভিন্ন স্থানে ডাকাতি ও দস্যুবৃত্তিতে লিপ্ত থাকে। তবে ১৭৯১ সালের পর ফকির-সন্ন্যাসীদের আন্দোলন সম্পর্কে আর বিশেষ কিছু জানা যায় না।

ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলন বাংলায় ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে একটি বলিষ্ঠ প্রতিরোধ হিসেবে চিহ্নিত। ডাকাতি ও দস্যুবৃত্তির ফলে যদিও তারা জনসমর্থন হারায় তথাপি ইংরেজদের অত্যাচার আর দুঃশাসনের বিরুদ্ধে এই সাধক শ্রেণীর প্রতিবাদী ও প্রতিরোধ আন্দোলন বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলনের প্রেরণা যুগিয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।