মনসব বা মনসবদার কি?

মনসবদার

মনসবদারী প্রথা সম্রাট আকবরের সমকালীন পৃথিবীর সামরিক সংস্কারের ইতিহাসে এক অভিনব সংযোজন। সম্রাট আকবর তার বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার আলোকে সামরিক বাহিনীতে শৃঙ্খলা আনয়ন, দূর্নীতি প্রতিরোধ ও শক্তিবৃদ্ধিকল্পে এ প্রথা প্রবর্তন করেন।

মনসব একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ উচু স্থান, যেখানে কিছু রাখা যায়। এ শব্দটি মোঘল প্রশাসনে পদ বা সম্মান বা অফিস অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এ পদের অধিকারীকে মনসবদার বলা হয়। মোঘল সম্রাট আকবর মনসবদারকে সমস্ত সামরিক দায়িত্ব পালনের জন্য নিযুক্ত করেন। যুদ্ধকালে এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজনে প্রত্যেক মনসবদার তার পদমর্যাদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যক সৈন্য, অশ্ব, হস্তী ইত্যাদি দ্বারা সামরিক সাহায্য প্রদানে বাধ্য থাকতেন।

মনসবদারদের যোগ্যতাঃ এ পদ বংশগত নয় বরং ব্যক্তিগত সামরিক গুণাগুণ ও দক্ষতার উপর নির্ভরশীল ছিল। প্রত্যেক মনসবদার তার পদমর্যাদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যক সৈন্য, হস্তি, ভারবাহী পশু এবং শকট প্রভূতি প্রস্তুত রাখতে বাধ্য থাকতেন।

নিয়োগ ব্যবস্থাঃ ঈশ্বরী প্রাসাদ এর মতে, “মনসবদারদের নিয়োগ, পদোন্নতি, পদচ্যুতি সম্পূর্ণরূপে সম্রাটের বিবেচনার উপর নির্ভর করত। সামরিক-বেসামরিক উভয় কর্মকর্তা দিগকেই মনসব নিয়োগ করা হতো।’’

মনসবের প্রকার বা স্তরঃ আইন-ই-আকবরীতে আবুল ফজল ৬৬টি মনসবের কথা উল্লেখ করলেও ঈশ্বরী প্রসাদ এর মতে বাস্তবে ৩৩টি মনসবের অস্তিত্বে ছিল। ঐতিহাসিক হুসাইনের মতে, সর্বোচ্চ পর্যায়ের মনসবদার মোট ১০,০০০ সৈন্য এবং সর্বনিম্ন পর্যায়ের মনসবদার ১০ জন সৈন্য প্রস্তুত রাখার দায়িত্ব প্রাপ্ত ছিলেন।

মনসবদারি প্রথার প্রভাব বা সুফলঃ

১. দ্রুত গোলাযোগ দমনঃ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে সেনা বাহিনী প্রতি পালনের সুবিধা থাকার কারণে কোন অংশে আকস্মিক বিদ্রোহ দেখা দিলে কেন্দ্রীয় সরকারের সাহায্যের অপেক্ষায় না থেকে স্থানীয় মনসবদারই তা দ্রুত দমন করতে পারতেন।

২. দুর্নীতি রোধে সক্ষমঃ মনসবদারী প্রথার তালিকা ভুক্তির কারণে সামরিক প্রশাসনে দুর্নীতি রোধ সম্ভব হয়।

৩. সামরিক সাফল্যঃ রণকৌশলের উপর পদোন্নতি নির্ভর করায় প্রত্যেক মনসবদার যুদ্ধ ক্ষেত্রে বিজয়ী হওয়ার জন্য প্রাণপন চেষ্টা করতেন এত সামরিক ক্ষেত্রে সাফল্য আসত।

নেতিবাচক প্রভাব বা কুফলঃ

১. জাতিগত সমস্যাঃ জাতিগতভাবে মনসবদারি প্রথা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন দলের মধ্যে ঈর্ষা ও দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল।

২. আনুগত্য অস্বীকারের প্রবণতা বৃদ্ধিঃ কেন্দ্রীয় বাহিনীকে বিকেন্দ্রীকরণ করার ফলে মাঝে মধ্যে মনসবদারগণ দুর্বল সম্রাটদের আনুগত্য অস্বীকার করতেন কিংবা সিংহাসনের প্রতিদ্বন্দ্বীদের পক্ষে যোগ দিতেন।

৩. ঐক্যের অভাবঃ মনসবদারী প্রথার অধীনে বিভিন্ন জাতির সমন্বয়ে সেনাবাহিনী গড়ে উঠার কারণে সেনাবাহিনীতে সুদৃঢ় ঐক্যের অভাব ছিল।

৪. ব্যয় বহুল প্রথাঃ মনসবদারী প্রথা ছিল একটি ব্যয় বহুল প্রথা। সঙ্গত কারণে রাজকোষও দ্রুত শূন্য হয়ে পড়ে। তাই মোঘল সম্রাজ্য ও দ্রুত ধ্বংসের সম্মুখীন হয়ে পড়ে।

সামরিক প্রশাসনের দুর্নীতি দমন ও শৃঙ্খলা আনয়নে মনসবদারী প্রথার প্রবর্তন সম্রাট আকবরের দূরদর্শিতা ও সামরিক বিচক্ষণতারই পরিচয় বহন করে। যদিও এ প্রথার কতিপয় কুফল লক্ষ্য করা গিয়েছে তথাপিও এ প্রথাকে অনেকে বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করেছেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।