মুঘল বিচার ব্যবস্থা

মুঘল বিচার ব্যবস্থা

যে কোন রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্যের সুষ্ঠু শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের ভূমিকা অনস্বীকার্য্য। তেমনি ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘলদের বিচার ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল। মুঘল আমলে বিচার ব্যবস্থায় আধুনিক রীতির বিধিবদ্ধ আইন না থাকলেও পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াস ও প্রচলিত রীতিনীতি মোতাবেক বিচার কার্য্য সম্পন্ন করা হতো।

মুঘল বিচার ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যঃ মুঘল আইন ও বিচার পদ্ধতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ন্যায় পরায়ণতা, সততা, কঠোরতা, নিরপেক্ষতা ও আইনের দৃষ্টিতে সকলের সমতা। মুঘল বাদশাগণ সপ্তাহে একদিন বিচারের জন্য নির্ধারিত রাখতেন। তারা কোন শ্রেণিভুক্ত লোকের স্বার্থ রক্ষার্থে নিয়োজিত ছিলেন না। সরকারি কাজে তারা সকলের সাথে সমান ব্যবহার করতেন। দণ্ড দেয়ার ব্যাপারে তারা হিন্দুমুসলমানদের মধ্যে কোন পার্থক্য করতেন না। অপরাধিকে শাস্তি প্রদান অপেক্ষা অপরাধ প্রবণতা দূর করা ও প্রতিরোধ করার উপরই মুঘল সম্রাটগণ অধিক গুরুত্বারোপ করতেন। দ্রুত বিচার কার্য্য সম্পাদন মুঘল বিচার ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য ছিল। কোন জটিল মামলার তথ্য আবিষ্কার করার জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হতো। গ্রাম বাসীদের বিচার পদ্ধতি ও শান্তি শৃঙ্খলার ব্যাপারে গ্রাম প্রধানদের উপর দায়িত্ব অর্পিত হত।

বিচার পদ্ধতিঃ মুঘল শাসনামলে বিচারকগণ বিচার কার্য্য সমাধা করতেন সরকারি ভবনে। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হলে বাদি-বিবাদী উভয়কে আদালতে হাজির হওয়ার সমন জারি করা হতো। দু’পক্ষের উপস্থিতিতে বা উভয় পক্ষের উকিলদের সম্মুখে সাক্ষ্য প্রমাণাদি সহ বিষয়াদির নির্ধারণ করা হতো। বাদিকে অবশ্যই দু’জন সাক্ষীকে আদলতে আনতে হতো।

সুলভ ও দ্রুত বিচার কাজ সম্পাদন ছিল মুঘল বিচার ব্যবস্থার অন্যতম দিক। বিচারের বিভিন্ন পদ্ধতিতে অযথা সময় নষ্ট করা হত না। ছোট-ছোট ফৌজদারী ও দেওয়ানী মামলার অধিকাংশই গ্রাম্য পঞ্চায়েতে নিষ্পত্তি হত। পরবর্তী পর্যায়ে মামলা জেলা বিচারকেরা মীমাংসা করতেন। কোন মামলার সাক্ষীকে উপস্থিত করার জন্য সর্বোচ্চ এক মাস সময় দেয়া হত। উকিল অযথা তর্ক-বিতর্ক করে সময় নষ্ট করতে পারতেন না। উপরোক্ত পদক্ষেপের ফলে মুঘল বিচার ব্যবস্থায় মানুষ দ্রুত ও সস্তায় বিচার পেতেন। নিরপেক্ষ বিচার, ফৌজদারী প্রশাসন ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত পরিদর্শন, দ্রুত বিচার কাজ সমাধান, দমন ও প্রতিরোধের উপর গুরুত্ব, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, পঞ্চায়েতের মাধ্যমে গ্রামীণ মোকাদ্দমা নিষ্পত্তি, স্থানীয় দায়িত্ব ও জনগণের আস্থা অর্জন ছিল মুঘল বিচার ব্যবস্থা বৈশিষ্ট্য। কিন্তু দোষ ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও মোঘলদের বিচার পদ্ধতি ছিল তখনকার সমাজ ও যুগের উপযোগী।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।