মুহতাসিব বলতে কি বুঝ?

মুহতাসিব

আব্বাসীয় শাসনামলে সর্বপ্রথম পুলিশ বিভাগের সমান্তরালে দিওয়ান আল হিসবা নামে একটি বিশেষ বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। তৃতীয় আব্বাসীয় খলিফা আল-মাহদি ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা। এ বিভাগের ভার প্রাপ্ত অফিসারের পদবি ছিল মুহতাসিব। মুহতাসিব আইন শৃঙ্খলা রক্ষা, বিশেষ করে নাগরিক জীবনের ধর্মীয় ও নৈতিক শৃঙ্খলা বিধানে নিয়োজিত ছিলেন। মাহদি সর্বপ্রথম কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মুহতাসিব নিয়োগ করলেও পরবর্তীতে রাজধানী ও প্রাদেশিক শহর সমূহে মুহতাসিব নিয়োগ করা হতো।

নিয়োগনীতিঃ খলিফা অথবা অসীম ক্ষমতা সম্পন্ন উজির উপযুক্ত ব্যক্তিকে মুহতাসিব নিয়োগ করতেন। ইসলামি আইনে বিশেষ পারদর্শী, ধর্মপ্রাণ, সৎ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে মহতাসিব নিয়োগ করা হতো। তাকে আকর্ষণীয় বেতন-ভাতাও দেয়া হতো।

প্রকার ভেদঃ আল মাওয়াদি দু’ধরনের মুহতাসিবের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন-

     ১. বেতনভুক্ত মুহতাসিব যারা রাষ্ট্রের নিয়মিত কর্মচারী ছিলেন।

     ২. অবৈতনিক স্বেচ্ছাসেবী মুহতাসিব।

প্রকৃত পক্ষে রাষ্ট্রের প্রতিটি সৎ ও ধার্মিক নাগরিক বাস্তবে মুহতাসিব ছিলেন। তারা স্বতঃস্ফুর্ত ও স্বেচ্ছা প্রণোদিত হয়ে মুহতাসিবের দায়িত্ব পালন করতেন।

মুহতাসিবের দায়িত্ব ও কর্তব্যঃ ঐতিহাসিকদের মতামতের ভিত্তিতে মুহতাসিবের দায়িত্ব ও কর্তব্যকে তিনভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

     ১. নৈতিক দায়িত্ব

     ২. ধর্মীয় দায়িত্ব এবং

     ৩. জনকল্যাণ মূলক কার্যাবলী।

১. নৈতিক দায়িত্ব ও সমূহঃ জনসাধারণকে ধর্মীয় ও নৈতিক কাজে উৎসাহিত করা এবং অন্যায় অপরাধ হতে বিরত রাখা ছিল মুহতাসিবের প্রধান কর্তব্য। সর্ব প্রকার সামাজিক অসাধুতা, ব্যবসায়-বাণিজ্যে প্রতারণা এবং ধর্ম বিরোধী কার্য্যকলাপ প্রতিরোধ করা তার কর্তব্য হিসেবে গণ্য ছিল। কাজির মত তিনি বিভিন্ন অপরাধের বিচার করতেন। তবে তার বিচার ছিল সংক্ষিপ্ত। অপরাধিকে ঘটনাস্থলে বিচার করাই ছিল তার ক্ষমতার আওতাভুক্ত।

২. ধর্মীয় দায়িত্ব সমূহঃ ইসলামের বিধি-বিধান, আচার অনুষ্ঠান যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে তিনি সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। তিনি মুসলমানদের জুমার নামাজে উপস্থিতি নিশ্চিত করতেন এবং রমজানের পবিত্রতা রক্ষার জন্য দিনে প্রকাশ্যে খাওয়া-দাওয়া নিষিদ্ধ রাখতেন। ইসলামের আইনের লঙ্ঘন ও প্রকাশ্যে বিধি বর্হিভূত কাজের উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ তার স্বীকৃত ক্ষমতা ছিল।

৩. জনকল্যাণ মূলক কার্যাবলীঃ জন সুবিধার্থে শহরে পানীয় জল সরবরাহ এবং শহর প্রাচীর ও দালান কোঠা রক্ষণাবেক্ষণ ছিল তার কর্তব্য। রাস্তাঘাটের উন্নতি বিধান, রাস্তাঘাটে আলো-সরবরাহের ব্যবস্থা, হাট বাজার, হাসপাতাল ও সরাইখানা রক্ষণাবেক্ষণ এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নতির সর্বপ্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করার দায়িত্ব তার উপর অর্পিত ছিল।

জনগণের ধর্মীয় নৈতিক ও জনকল্যাণ মূলক কার্য্য তদারক ও পর্য্যবেক্ষণকারী মুহতাসিব পদটি আব্বাসীয় খলিফা আল মাহদির অবিস্মরণীয় আবিষ্কার। পরবর্তীকালে ভারত বর্ষে সুলতানী ও মোঘল আমলে মুহতাসিব পদটি সুনামের সাথে প্রচলিত ছিল।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।