ধর্ম কি? ধর্ম কত প্রকার ও কি কি?

ধর্ম কি?

ধর্ম কি? মানব জবিনে এর প্রয়োজনীয়তা কি? এটি বিজ্ঞানাগার নাসা কিংবা বেল-ডেল এর উদ্ভাবিত নতুন কোন সমস্যা নয়। বরং এ প্রশ্ন হাজার বছরের পুরোন। যুগে যুগে মানুষের মনে বারবার এ প্রশ্নটি নাড়াচাড়া দিয়ে এসেছে। বিজ্ঞানের সাফল্য মানুষের মনকে যখন প্রসারিত করেছে, বিশ্বাসকে করেছে জয়, কল্পনাকে করেছে বাস্তব। জাগতিক গন্ডি ছেড়ে বিজ্ঞান যখন মহাজাগতিক চিন্তায় বিভোর, ঠিক তখনি আরো জোরালো ভঅবে আবেদন আসল ধর্ম ও ধর্মের বৈধতা নিয়ে। প্রশ্ন উঠল সৃষ্টি-স্রষ্টা আর স্রষ্টার অস্তিত্ব নিয়ে। অধুনা বিজ্ঞান ছুটে চলেছে জাগতিক-মহাজাগতিক সৃষ্টি-স্রষ্টা আর স্রষ্টার স্রূপের স্বন্ধানে। নিরন্তন চলছে সেই নিগূঢ় তথ্যের অনুসন্ধান। কোথায় এর উৎস? কে বা কারা সৃষ্টি করল এই ধর্ম? ধর্মই কি পৃথিবীর মূল? না অন্য কিছু? অনুসন্ধি’সু, জ্ঞান-পিপাসু আত্মার ছুটে চলা সেই শিকড়ের সন্ধানে। আজ আর অজানা নয় উদ্ভাসিত হয়েছে সেই আলো, উন্মোচিত হয়েছে সেই নিগূঢ় তথ্য। অজ্ঞতার অন্ধকার ছিন্ন করে বেড়িয়ে এসেছে প্রকৃত ধর্মতত্ত্ব।

মোদ্দা কথা যা ধারণ যোগ্য তাই ধর্ম (ধৃ [ধারণ]+ ম = ধর্ম)। পরিদৃষ্ট এবং জ্ঞাত-অজ্ঞাত জগতসমূহের তাবত বস্তুকে সতন্ত্র (কোন কোন ধর্ম মতে একের অধিক) কোন স্রষ্টার সৃষ্টবস্তু জ্ঞান করে সেই অসীম-পরাক্রমশীল শক্তির আরাধনা পদ্ধতিকেই ধর্ম বলে। যেমন- ইসলাম ধর্ম, হিন্দু ধর্ম, খ্রীষ্টান ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম।

ব্যাবিলিয়ন অভিধান মনে– “মানুষের অস্তিত্ব এবং বিশ্ব পরিমন্ডলের উপর যে বিশ্বাস- তাই ধর্ম।”

অক্সফোর্ড অভিধান মতে- “কোন মহাজাগতিক শক্তিতে বিশ্বাস স্থাপন করে সেই শক্তির আরাধনা করার নামই ধর্ম।”

অর্থাৎ বিশ্বাস-ই হলো ধর্মের মূল কথা।

ধর্মে প্রকারভেদঃ

বর্তমান পৃথিবীতে অনেক অনেক ধর্মে আছে। তার মধ্যে হতে হাতেগণা কয়েকটা ধর্মে নাম আমরা বলতে পারব বা জানি। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণার মাধ্যমে জানাগেছে যে, পৃথিবীতে মোটামুটি ৪২০০ থেকে ৪৫০০ টির মত ধর্ম আছে। তবে এগুলো অনেক ধর্ম এখন বিলুপ্ত। শ্বিাস থেকেই ধর্মের সৃষ্টি। কথাটা আজ আর উপেখ্সিত নয়। বরং সুনির্দিষ্ট বিচার-বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে প্রমাণিত। পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাবের গোড়া থেকেই মানুষ এই বিশ্বাসকে লালন-পালন করে আসছে। কেবলমাত্র কালের গতিতে পাল্টে গেছে বিশ্বাসের শিকড়টা। একজন থেকে দুইজন, দুইজন থেকে ক্রমবর্ধমানভাবে বেড়েই চলেছে মানুষ। মানুষ থেকে মানুষ সৃষ্টি আর মন থেকে নানা মতের সৃষ্টি। কারো বিশ্বাস মহাজাগতিক বিষয়ে, কারো জাগতিক, কেউবা বস্তুতে বিশ্বাসী আবার কেউ অবিশ্বাসী। মূলত বিজ্ঞানের অনুপস্থিতি, অনুন্নত বিজ্ঞান আর জ্ঞানের সুস্থ্য পরিস্ফুটনের অভাবেই মানুষের ‘বিশ্বাস’ মূল বিশ্বাস থেকে চুত্য হয়েছে। আর সেই সাথে বিশ্বাস, উৎপত্তি ও অঞ্চলভেদে গড়ে উঠেছে নানান ধর্ম। এখানে আমরা জানব বিশ্বাস, অঞ্চল ও উৎপত্তিভেদে ধর্মগুলোর শ্রেণীবিন্যাস।

ধর্ম

প্রথমে জানব অঞ্চলভিত্তিক শ্রেণীবিন্যাসঃ

অঞ্চলভিত্তিক ধর্মকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। ১. সেমেটিক ২. নন-সেমেটিক

সেমেটিক ধর্মঃ সেম চিল হযরত নূহ(আঃ) (বাইবেলে হযরত নূহ আঃ কে নোহা বলা হয়েছে) এর পুত্র। সেম থেকে এসেছে সেমেটিক শব্দটি। সেমেটিক অঞ্চলভূক্ত ছিল ইরাক, জেরুজালেম, জর্দান, তুর্কিস্তান, আরব-আমিরাত, আরব ইত্যাদি। এসব স্থানের ধর্মমত কে বলা হয় সেমেটিক ধর্ম। সেমেটিক ধর্ম মূলত হিব্রু, আরবীয়, আসিরীয়, ফিনিসীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত ছিল। যেমন- ইসলাম, ইহুদী, খ্রীষ্টান ইত্যাদি।

সেমেটিক অঞ্চল
সেমেটিক অঞ্চল

নন-সেমেটিক ধর্মঃ সেমেটিক বর্হিভূত অঞ্চল থেকে যেসব ধর্মের উদ্ভব হয়েছে, সে সব ধর্মমত কে নন-সেমেটিক ধর্ম বলে। নন-সেমেটিক অঞ্চলের ধর্মগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। ১. এরিয়ান, ২. নন-এরিয়ান।

এরিয়ানঃ ইন্দো-ইউরোপিয়ান ভাষাভুক্ত জনগোষ্ঠীর ধর্ম। মূলত আর্যভাষীদের (ভারত, পারস্য ইত্যাদি) ধর্ম। এই ধর্ম গুলোর উৎপত্তিকাল মোটামুটি ২০০০ থেকে ২৫০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ। এরিয়ান ধর্মগুলোকে আবার দুই ভাবে বিভক্ত করা যায়। ১. বেদীক, ২. নন-বেদীক

বেদীক ধর্মঃ যেসব ধর্ম এর মূল উৎস্য বেদ (অর্থাৎ যেসব ধর্মমত বেদকে সৃষ্টিকর্তার প্রত্যাদেশিত গ্রন্থ বলে সাব্যস্ত করে তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছে।) সে সব ধর্মকে বেদীক ধর্ম বলে। যেমনঃ- হিন্দু ধর্ম।

নন-বেদীক ধর্মঃ যেসব ধর্ম বেদকে সৃষ্টিকর্তার প্রত্যাদেশিত গ্রন্থ বলে স্বীকার করতে নারাজ এবং (অর্থাৎ যেসব ধর্মমত বেদের বৈধতা স্বীকার করে না) সে সব ধর্মকে নন-বেদকি ধর্ম বলে। যেমন- বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, জোরাস্ট্রেয়ান ইত্যাদি।

নন-এরিয়ানঃ কনফিউশিয়ানিজম, টয়োজম, সেন্টোজম হলো নন-এরিয়ান ধর্ম। এই ধর্মগুলো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। যেমন- কনফিউশিয়ানিজম, টয়োজম চীনের, সেন্টোজম জাপানের জনগোষ্ঠীর ধর্ম। এই ধর্ম গুলো ঈশ্বরে বিশ্বাসী নয়, সামাজিক মূল্যবোধ এবং নৈতিকতাই ধর্মের মূল মন্ত্র।

বিশ্বাসভেদে ধর্মে শ্রেণী বিভাগঃ

বিশ্বাসভেদে ধর্মের ৭টি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়।

১. একশ্বরবাদীঃ যাহারা একজন সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করেন, তাদের কে একশ্বরবাদী বলে। এই ধর্মগুলোকে একশ্বরবাদী ধর্ম বলা হয়। যেমনঃ- ইসলাম, ইহুদী, খ্রীষ্টান, জোরাস্ট্রেইনিজম, শিখ, কাউডিয়াজম, বাহিজম।

২. দ্বি-ঈশ্বরবাদীঃ যেসব ধর্মে দুইজন সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করে তাদের দ্বি-ঈশ্বরবাদী বলে। যেমন- জৈন, ম্যান্ডানিয়েজম, ম্যানিচেইনিজম।

৩. বহু-ঈশ্বরবাদীঃ যেসব ধর্মে দুই জন এর বেশি সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস করা হয়, তাকে বহু-ঈশ্বরবাদী ধর্ম বলে। যেমন- হিন্দু, সেন্টোইজম।

৪. সন্ন্যাসব্রতঃ যেসব ধর্ম পরিবার-পরিজন, কাম, ভোগ ত্যাগ করে মনের শক্তির উপর নির্ভর করে জীবন যাপন করে এবং একাকি থাকিতে ভালোবাসে, তারা সন্ন্যাসি এবং এদের ধর্মকে সন্ন্যাসব্রত ধর্ম বলে। যেমন- বৌদ্ধ।

৫. নৈতিকঃ যেসব ধর্ম নৈতিককতা, সামাজিক মূল্যবোদ ও নিতীর উপর নির্ভর করে সেই ধর্মগুলোকে নৈতিক ধর্ম বলে। যেমন- কনফিউষিয়ানিজম, টয়োজম, বৌদ্ধ।

৬. নাস্তিকঃ যাহারা কোন সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস করে না এবং কোন ধর্মকে মানে না, তারা নাস্তিক এবং এরা যে পথ অনুসরণ করে, তাকেই নাস্তিকতা বলে।

৭. প্রকৃতবাদীঃ যেসব ব্যক্তি প্রকৃতিকে কে ভালোবাসে এবং প্রকৃতিকে বিশ্বাস করে তবে কোন সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস করে না, তারা এই প্রকৃতবাদী ।

উৎপত্তি ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে ধর্মের শ্রেণীবিন্যাসঃ

ধর্মে নাম                           উৎপত্তিকাল                  অনুসারী সংখ্যা

ইসলাম                        সৃষ্টির সূচনা লগ্নে                        ১.৮ বিলিয়ন

হিন্দু                             ২৯০০-২৫০০ খ্রীষ্টপূর্ব               ৯০০ মিলিয়ন

ইহুদী                            ১৪৪৫-১৪০৫ খ্রীষ্টপূবাব্দের মধ্যে ১৪.১ মিলিয়ন

জোরাস্ট্রেইনিজম         ১৪০০-১২০০ খ্রীষ্টপূর্ব                 ২.৬ মিলিয়ন

টায়োজম                     ৫৭০ খ্রীষ্টপূর্ব                             ৫০ মিলিয়ন

বৌদ্ধ                            ৫৬০-৪৮০ খ্রীষ্টপূর্ব                   ৩৭৬ মিলিয়ন

জৈন                            ৫২৭ খ্রীষ্টপূর্ব                             ৪ মিলিয়ন

কনফিউশনিজম          ৪৭৯ খ্যষ্টিপূর্ব                            ৬০০০০০

ম্যান্ডানিয়েজম             ১ খ্রীষ্টাব্দ                                    ৬৫০০০

খ্রীষ্টান                          ৪ খ্রীষ্টপূর্বাদ থেকে ২৯ খ্রীষ্টাব্দ    ২.২ বিলিয়ন

ম্যানিজেইজম              ২১৬-২৭৬ খ্রীষ্টাব্দ                     ২ মিলিয়ন

সেন্টোজম                   ৫৫২ খ্রীষ্টাব্দ                              ৪ মিলিয়ন

শিখ                              ১৫৩৯ খ্রীষ্টাব্দ                            ২২ মিলিয়ন

কাউডিয়াজম               ১৯২০ খ্রীষ্টাব্দ                             ৪ মিলিয়ন

বাহিজম                       ২৩শে মে ১৮৪৪ সাল                ৬ মিলিয়ন

বিভিন্ন ধর্মের নাম

পৃথিবীতে অনেক ধর্ম আছে। সব ধর্ম বর্তমানে পৃথিবীতে নেই বললেই চলে যেগুলো আছে। তার মধ্যে হতে এখানে ৪০টি ধর্মে নামলিখা হলো। এখানে নাম্বারিং এর সাথে কারো ধর্মকে ছোট বা বড় করে দেখা হচ্ছে না। শুধু সংখ্যায়িত করার জন্য আমরা এখানে নাম্বার বা সংখ্যা ব্যবহার করছি। তাই কেউ যেন মনে করেন না,আপনার ধর্ম বড় আর অন্যের ধর্ম ছোট বা আপনারটা এতো নাম্বার অন্যেরটা অত নাম্বার। যাই হোক চলা যাক ৪০টি ধর্মে নাম।

  • ১. ইসলাম
  • ২. হিন্দু
  • ৩. ইহুদী
  • ৪. জোরাস্ট্রেইনিজম
  • ৫. টায়োজম
  • ৬. বৌদ্ধ
  • ৭. জৈন
  • ৮. কনফিউশনিজম
  • ৯. ম্যান্ডানিয়েজম
  • ১০. খ্রীষ্টান
  • ১১. ম্যানিজেইজম
  • ১২. সেন্টোজম
  • ১৩. শিখ
  • ১৪. কাউডিয়াজম
  • ১৫. বাহিজম
  • ১৬. তাই চি
  • ১৭. মোহিজম
  • ১৮. থেলের্না
  • ১৯. ভিসনাভিজম
  • ২০. স্প্রিটিজম
  • ২১. নিও-প্যাগান
  • ২২. ইন্নোকিও
  • ২৩. টেনারিকিও
  • ২৪. ইউনভার্সালিজম
  • ২৫. রাসটাটারিয়ানিজম
  • ২৬. শয়তানিজম
  • ২৭. ডিসকর্ডিয়ানিজম
  • ২৮. ফালুংগং
  • ২৯. সামারিতানিজম
  • ৩০. জুসে
  • ৩১. চু হাসি
  • ৩২. ফ্রেরুডায়ানিজম
  • ৩৩. মার্ক্সিজম
  • ৩৪. এ্যাথিজম
  • ৩৫. হিউম্যানিজম
  • ৩৬. উইছা
  • ৩৭. প্যান্থেজম
  • ৩৮. অ্যানিমিজম
  • ৩৯. ফাল্লিসজম
  • ৪০. ইউনিটারিয়ানিজম

আমরা আশাকরি আপনাদের এই ধর্ম ও ধর্ম বিষয়ক তথ্যবহুল লেখাটি ভালো লাগবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।