১৯৭১ সালে বুদ্ধিজীবী হত্যা

বুদ্ধিজীবী হত্যা

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের হত্যা ইতিহাসের একটি জঘন্য, সৃশংসতম ও বর্বরোচিত ঘটনা। পাক সামরিক জান্তা মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে নিশ্চিত পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণার্থে বেছে বেছে বুদ্ধিজীবীদের হত্য করে। এ যুদ্ধে বাংলার সূর্য সন্তানদের অর্থাৎ শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, আইনবিদ, রাজনীতিবিদ প্রমুখকে সুপরিকল্পিতভাবে নিধন করা হয়। পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠীর নির্দেশনা ও মদদে এক শ্রেণীর দালাল এই হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত করে।

বুদ্ধিজীবী হত্যাঃ পূর্ব পাকিস্তান বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের নিশ্চিহ্ন করার এ নীলনকশা প্রণয়ন করেন পূর্ব পাকিস্তানের গর্ভনরের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। অভিযোগ রয়েছে যে, হানাদার বাহিনী থেকে অস্ত্রশস্ত্র ও সার্বিক সাহায্য নিয়ে তাদেরই ছত্রছায়ায় প্যারামিলিটারি রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস প্রভৃতি বাহিনীর সশস্ত্র ক্যাডাররা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। তারা বুদ্ধিজীবীদেরকে তাদের প্রতিপক্ষ অভ্যন্তরীণ শত্রু, ভারতীয় চর প্রভৃতি নামে চিহ্নিত করে। তাই তারা মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি নিরস্ত্র ও নিরীহ বাঙালি জাতির বিবেক বুদ্ধিজীবীদের হত্যার নীলনকশা বাস্তবায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রি থেকে ১৬ ডিসেম্বরের পূর্ব পর্যন্ত বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড অব্যাহত থাকে। বুদ্ধিজীবীদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাড়ি হতে ধরে নিয়ে প্রায়শ কালো কাপড়ে চোখ বেঁধে নেওয়া হতো। নিকটস্থ কোনো ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে তাদের উপর নির্মম দৈহিক নির্যাতন ও বেয়োনেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করা হতো। অনেককেই বধ্যভূমিতে নিয়ে হত্যা করা হতো। ১৪ ডিসেম্বর বিজয়ের পূর্বক্ষণে পাকবাহিনী ও তাদের মিত্ররা বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করে। বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ করে মোহাম্মদপুর শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্র বা আল-বদর সদর দপ্তরে নেওয়া হতো। ১৪ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের পূর্বে বুদ্ধিজীবীদের ব্যাপকভাবে হত্যা করা হয়। মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার বধ্যভূমি, মিরপুর বধ্যভূমিতে ডোবানালা, নিচু জমি ও ইটের পাঁজার মধ্যে বহুসংখ্যক মৃতদেহ বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। তাদের বুকে, মাথায় ও পিঠে ছিল বুলেটের আঘাত এবং সারাদেহে বেয়োনেটের ক্ষতচিহ্ন। বাঙালিকে মেধাশূন্য করার পাকিস্তানি পরিকল্পনাকেই আল-বদর, আল-শামসরা নিষ্ঠুরভাবে বাস্তবায়ন করে। উল্লেখ্য ১৪ ডিসেম্বর প্রতিবছর শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস হিসেবে পালিত হয়। বাংলাদেশ নামক প্রামাণ্য গ্রন্থের পরিসংখ্যান অনুযায়ী শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যা মোট ১,১০৯ জন। এদের মধ্যে ছিলেন শিক্ষাবিদ ৯৯১ জন, সাংবাদিক ১৩ জন, চিকিৎসক ৪৯ জন, ৪২ জন আইনজীবী এবং সাহিত্যিক, শিল্পী ও প্রকৌশলী ছিলেন ১৬ জন। মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের হত্যা ইতিহাসে বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে আখ্যায়িত।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।